তিন দশকের বেশি সময় ধরে ভালুকায় মানবসেবায় ফাদার বেন্জামিন গোমেজ

আনোয়ার হোসেন তরফদার, ভালুকা( ময়মনসিংহ)
প্রকাশিত : ১০ মে ২০২৬, ০১:৩৯ পিএম
0 শেয়ার
তিন দশকের বেশি সময় ধরে ভালুকায় মানবসেবায় ফাদার বেন্জামিন গোমেজ

ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার হবিরবাড়ি ইউনিয়নের আওলাতলী গ্রামের নলুয়াকুড়ি ক্যাথলিক মিশন—‘সাধুগুইডো মারিয়া কনফোর্টি ধর্মপল্লী’। এই ধর্মপল্লীকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে মানবসেবায় নিয়োজিত রয়েছেন ফাদার বেন্জামিন গোমেজ এসএক্স। 

১৯৯১ সালে সুদূর স্পেন থেকে বাংলাদেশে আগমন করেন তিনি। পরে ভালুকায় দায়িত্ব গ্রহণ করে হতদরিদ্র, অসহায় ও ভূমিহীন মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করেন। জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে অসাম্প্রদায়িক চেতনা, ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির ভিত্তিতে এলাকায় গড়ে তুলেছেন মানবিক সহায়তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

স্থানীয়দের কাছে অত্যন্ত সুপরিচিত ও শ্রদ্ধেয় এই ধর্মযাজক শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে রেখে চলেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তাঁর উদ্যোগে এলাকায় লাউতি নদীর ওপর নির্মিত হয়েছে একটি সেতু। স্থাপিত হয়েছে ২৪টি ফিডার স্কুল, ১৭টি ইন্টাভিটা স্কুল এবং ৯টি এডুকো শিক্ষালয়।
শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক মানের ছেলে হোস্টেল এবং মেয়েদের জন্য ‘রোজলীন হোস্টেল’। কারিগরি শিক্ষার প্রসারে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে টেকনিক্যাল স্কুল (এনটিএস), যেখানে সেলাই, অটোমোবাইল, ইলেকট্রিসিটি, ওয়েল্ডিং ও কম্পিউটার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

স্বাস্থ্যসেবাতেও রয়েছে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান। ‘ফাদার ত্বনীয় মেমোরিয়াল’ নামে ২৫ শয্যার একটি মিশন হাসপাতালের মাধ্যমে অসহায় মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি দরিদ্র ও ভূমিহীন মানুষের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থাও করেছেন তিনি।
সমাজ উন্নয়নে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, মাদকবিরোধী সচেতনতা এবং শিক্ষার প্রসারে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।

নলুয়াকুড়ি কুমারী মারিয়া আধুনিক উচ্চ বিদ্যালয়সহ নানা প্রতিষ্ঠান তাঁর উদ্যোগেই গড়ে উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা জোসেফ বলেন, “ফাদার বেন্জামিন গোমেজ শুধু একজন ধর্মযাজক নন, তিনি মানবতার সেবায় নিবেদিত এক আলোকবর্তিকা। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে ভালুকার মানুষের ভালোবাসার মাঝেই থাকতে চান।”
আবাসন প্রকল্পের সুবিধাভোগী এক নারী বলেন, “ফাদার আমাদের থাকার জন্য বিনামূল্যে বাড়ি করে দিয়েছেন। আমরা এখানে শতাধিক পরিবার ঘর পেয়েছি। তাঁদের সহযোগিতায় আমাদের সন্তানদের মানুষ করতে পেরেছি। আমার তিন মেয়ে কুমারী মারিয়া স্কুলে পড়ছে, তাদের পড়াশোনার সব খরচ ফাদার বহন করছেন।”

তিনি আরও বলেন, “আমার পা ভেঙে যাওয়ার পর দুইবার অপারেশন করতে হয়েছে। পুরো চিকিৎসা ব্যয়ও ফাদার দিয়েছেন। আমরা সনাতন ধর্ম পালন করি, কিন্তু কখনো ধর্ম পরিবর্তনের কথা বলেননি। ধর্মীয় স্বাধীনতা রেখেই তিনি সবাইকে সহযোগিতা করেন।”

নলুয়াকুড়ি কুমারী মারিয়া আধুনিক উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক এক শিক্ষার্থী বলেন, “স্কুলটিতে শুধু ভালো পড়াশোনাই নয়, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চারও সুযোগ রয়েছে। এলাকার দরিদ্র মানুষের জন্য হাসপাতাল এবং পথশিশুদের জন্য আবাসিক হোস্টেল আমাদের বড় প্রাপ্তি।”

মানবকল্যাণে ফাদার বেন্জামিন গোমেজের এই দীর্ঘ অবদান ভালুকা অঞ্চলে উন্নয়ন, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।