“২০ টাকা সদকা ফাউন্ডেশন” এর নীরব বিপ্লব

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ৭ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:১৭ পিএম

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ থেকে শুরু হওয়া এক নীরব বিপ্লব। ছোট অঙ্কের দানকে একত্রিত করে এই ‘২০ টাকা সদকা ফাউন্ডেশন’ প্রমাণ করে দিল, জনহিতকর কাজের জন্য অর্থের পরিমাণ নয়, সদিচ্ছাই যথেষ্ট। প্রতিষ্ঠার পর প্রথম বছরেই ৩৪টি পরিবারকে খাদ্য নিরাপত্তা দিয়েছে এই প্রচারবিমুখ দলটি।

​একটি চা বা সিগারেটের দাম—মাত্র ২০ টাকা। প্রতিদিনের এই সামান্য খরচই সমাজের একদল মানুষের কাছে আশীর্বাদ হয়ে আসতে পারে, তা প্রমাণ করেছে ‘২০ টাকা সদকা ফাউন্ডেশন’। এই সংগঠনটি গত ২০২৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জের কয়েকজন নিবেদিতপ্রাণ তরুণের উদ্যোগে গঠিত হয়। তাদের লক্ষ্য: সচ্ছল মানুষদের কাছ থেকে নামমাত্র ২০ টাকা করে সংগ্রহ করে দুস্থ ও অসচ্ছল পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী নিশ্চিত করা।

অন্যান্য সংগঠনের মতো জাকজমকপূর্ণ যাত্রা এই ফাউন্ডেশনের ছিল না। ঈশ্বরগঞ্জের কয়েকজন তরুণ একটি মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে নীরবে কাজ শুরু করেন—নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে মানুষের সেবা করা। এর মূল কারণ, পবিত্র ইসলাম ধর্মে লোকদেখানো দানকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তারা বিশ্বাস করেন, তাদের নাম বা পরিচিতি নয়, বরং তাদের কাজই সমাজে আলো ছড়াবে।

​একথা আমাদের সমাজে এখন প্রায়ই শোনা যায়—ভালো কাজ করার জন্য বড় অর্থের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন শুধু বড় হৃদয়ের। এই সত্যটিকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে ‘২০ টাকা সদকা ফাউন্ডেশন’। তারা সমাজের সচ্ছল মানুষদের কাছ থেকে মাত্র ২০ টাকা করে সংগ্রহ করে সেই অর্থ দিয়ে দুস্থ ও অসচ্ছল পরিবারের জন্য বাজার বা প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী কিনে দেয়।

​সম্প্রতি এই ফাউন্ডেশন তাদের মানবিক প্রচেষ্টার এক উল্লেখযোগ্য মাইলফলক ছুঁয়েছে—তারা ইতোমধ্যে ৩৪ জন অসহায় মানুষকে বাজারভর্তি ব্যাগ উপহার দিয়েছে। এই বাজার শুধু খাদ্য নয়, এটি আসলে আশা ও নির্ভরতার প্রতীক।​তবে এই উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অনুপ্রেরণামূলক দিক হলো—ফাউন্ডেশনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা তাদের নাম বা পরিচয় প্রকাশে সম্পূর্ণরূপে অনিচ্ছুক। তারা মনে করেন, তাদের এই প্রচেষ্টা ব্যক্তিগত প্রচারের জন্য নয়, বরং এটি একান্তই মানুষের উপকারে আসার এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মাধ্যম।

​এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফাউন্ডেশনের এক সদস্য নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তার আবেগ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন ​”​”আমাদের চাওয়া একটাই—কেউ যেন ক্ষুধার্ত না থাকে। আমাদের নাম বা পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ নয়। যদি একজন মানুষও জানতে পারেন, কেবল ২০ টাকার মতো ছোট একটি অনুদানও সম্মিলিতভাবে একটি পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে পারে, তবে সেই বার্তাই আমাদের জন্য যথেষ্ট। ৩৪টি পরিবারকে বাজার করে দিতে পেরে আমরা আনন্দিত, এবং এই পুরো সফলতা আমাদের সকল সম্মানিত দাতাদের। আমরা শুধুমাত্র একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করছি। আমাদের লক্ষ্য, নীরবে আরও বহু মানুষের পাশে দাঁড়ানো।”

​’২০ টাকা সদকা ফাউন্ডেশন’-এর স্বেচ্ছাসেবকরা অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে তহবিল সংগ্রহ করেন এবং সরাসরি সেই অর্থ দিয়ে অসহায় পরিবারের প্রয়োজন অনুযায়ী বাজার কিনে দেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগী বা অপচয়ের কোনো সুযোগ থাকে না, ফলে প্রতিটি ২০ টাকাই তার সর্বোচ্চ মানবিক মূল্য নিশ্চিত করে।​সমাজের প্রতি ফাউন্ডেশনের এই নিবেদিত মনোভাব, বিশেষ করে মহামারীর মতো পরিস্থিতিতে, যখন বহু পরিবার কর্মহীন বা অর্থনৈতিক সংকটে ভোগেন, তখন তা এক অন্ধকারে আলোর রেখা দেখায়।​সমাজের এই সম্মিলিত শক্তিই একদিন দারিদ্র্যমুক্ত ও মানবিক সমাজ গঠনে প্রধান হাতিয়ার হবে—’২০ টাকা সদকা ফাউন্ডেশন’-এর দিকে তাকালে সেই আশাই জাগে।

 সম্পাদক ও প্রকাশক : আশিকুর রহমান | কপিরাইট © ভোরের পোস্ট, সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন